ক্রিপ্টোকারেন্সি কি? What is Cryptocurrency?


 ক্রিপ্টোকারেন্সি (Cryptocurrency) এক ধরনের সাংকেতিক ডিজিটাল মুদ্রা! শুধুমাত্র ইন্টারনেট জগতেই এই মুদ্রা ব্যবহার করা হয়, বাস্তবে এই ধরনের মুদ্রার কোন অস্তিত্ব নেই! এটি এমন এক ধরনের মুদ্রা যা কোন দেশের সরকার ছাপায়নি বরং এই অর্থ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের দ্বারা ছোট ছোট কোডের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে! আজকের এই ব্লগে ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পর্কে আলোচনা করা হবে!
ক্রিপ্টোকারেন্সি বুঝতে হলে ডিজিটাল মুদ্রার সম্পর্কে জানতে হবে, ১৯৬০ এর দশকে ডাইনার্স ক্লাব (Diners Club) নামক এক ধরনের ক্রেডিট কার্ডের (Credit card) মাধ্যমে সর্বপ্রথম ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন ঘটেছিল! ১৯৭০ সালের পর থেকে ক্রেডিট কার্ড অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে, বর্তমানে আমরা অনলাইন ব্যাংকিং এবং মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে ডিজিটাল্লি (digitally) অর্থ আদান-প্রদান করি এসব প্রতিষ্ঠান তাদের সার্ভিস চার্জ বাবদ বেশ কিছু টাকা কেটে রাখে! আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আবার সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় ফলের সামগ্রিক অর্থনীতি গুটি কতক লোকের হাতে জিম্মি থাকে এছাড়া লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থের মালিক গোপন তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয় এবং নানান ধরনের বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকে পড়ে, অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি আরো ঝুঁকিপূর্ণ! কম্পিউটার ভিত্তিক যোগাযোগের ব্যাপক প্রচলন হবার পর থেকে মানুষ এমন এক ধরনের মুদ্রার স্বপ্ন দেখে আসছে যাক কোন ধরনের তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই পরিচালিত হবে! ১৯৮৩ সালে ডেভিড চাউম (David Chaum) নামক একজন আমেরিকান কম্পিউটার সাইন্টিস্ট ক্রিপ্টোগ্রাফিক (Cryptographic) পদ্ধতিতে মুদ্রা আদান-প্রদানের ধারণা প্রবর্তন করেন, ১৯৯৫ সালে তিনি ডিজি ক্যাশের (DIGI CASH) মাধ্যমে ক্রিপ্টোগ্রাফিক ইলেকট্রনিক পেমেন্টের (payment) প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেন কিন্তু তখনও ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা এবং নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর প্রযুক্তির অভাব ছিল! দীর্ঘদিন থেকে এসব সমস্যার সমাধান চাওয়া হলেও কেউই তা করতে পারছিল না! ২০০৮/২০০৯ সালের থেকে সাতোশি নাকামোতো (Satoshi Nakamoto) নামক এক ছদ্দবেশী চরিত্র এই সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হন! তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সির জনক হিসেবে পরিচিত!
কিন্তু এই সাতোশি নাকামোতো আসলে কে তা কেউই জানেনা! এটি কি কোন একক ব্যক্তির নাম নাকি একদল সফটওয়্যার বিজ্ঞানী তাও জানা যায়নি! প্রকৃত সাতোশি নাকামোতো নিজেও চায়না যে কেউ তাকে খুঁজে বের করতে পারুক! ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল ধারণাই হলো যে কেউ তার পরিচয় গোপন করে নিরাপদে সাধারণ মুদ্রার মতই ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করতে পারবে! ক্রিপ্টোকারেন্সির ওয়ালেট (Wallet) খুলতে ব্যবহারকারীর নাম, ঠিকানা বা ব্যক্তিগত তথ্যের প্রয়োজন হয়না!
ক্রিপ্টোকারেন্সি সরাসরি এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির ওয়ালেটে ট্রান্সফার (Transfer) হয় মাঝখানে কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খবরদারি করতে পারেনা! ক্রিপ্টোকারেন্সি এর ক্ষেত্রে যেহেতু কোনো তৃতীয় পক্ষ সেবা প্রদান করেনা তাই এখানে কোন বাড়তি চার্জ (Charge) ও নেই, সাতোশি নাকামোতোর আবিষ্কৃত ক্রিপ্টোকারেন্সি পদ্ধতির প্রথম মুদ্রার নাম বিটকয়েন (Bitcoin)
বিটকয়েনের সফলতা এবং জনপ্রিয়তার পর এরকম অসংখ্য ক্রিপ্টোকারেন্সির উদ্ভব হয়েছে! বর্তমানে ৪ হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি রয়েছে! ইথেরিয়াম (ethereum), লাইট কয়েন (litecoin), রিপল (ripple), বাইট কয়েন (Bytecoin) এবং ডজ কয়েন (Doge coin) সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য,
সাতোশি নাকামোতোর যে আবিষ্কারের কারণে ক্রিপ্টোকারেন্সি তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল তার নাম ব্লকচেইন (Block chain) ব্লকচেইন হল তথ্য সংরক্ষণের এক নতুন পদ্ধতি, ব্লকচেইন কে বলা যায় এক ধরনের লেজার বা হিসেবের খাতা যা ব্যাংকের মতো ডিজিটাল অর্থনৈতিক লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করে,
কিন্তু এই লেনদেনের হিসাব কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকেনা! বরং এই লেজার ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে দেখা যায়! এবং প্রতিটি লেনদেন ঘটার সাথে সাথে এই হিসেবের খাতা আপডেট হয়ে যায়! ক্রিপ্টোকারেন্সির বিশাল হিসাব মিলানো সহজ কাজ নয় আবার এই কাজ করার জন্য কোন প্রতিষ্ঠানো নেই! এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য একদল লোক ভলেন্টিয়ার volunteer বা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে, বিনিময় ব্লক চেইন সিস্টেম সেসব ভলেন্টিয়ার দের কে ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রদান করে! ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য কাজ করে ডিজিটাল অর্থোপার্জন কে বলা হয় মাইনিং (Mining)
মাইনিং করার জন্য শক্তিশালী কম্পিউটার এর প্রয়োজন হয় এছাড়াও এর সকল কাজে বিপুল পরিমান বিদ্যুৎ ও খরচ হয়!
ক্রিপ্টোকারেন্সির জন্মই হয়েছে পরিচয় গোপন রেখে নিরাপদে অর্থ লেনদেন করার জন্য কিন্তু এর পরও এই মুদ্রা ব্যবস্থায় বেশকিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে!
ক্রিপ্টোকারেন্সির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দিক হলো আপনি যদি একবার এর পাসওয়ার্ড ভুলে যান তাহলে আপনার টাকা আর কখনো ফিরে পাবেন না! কারণ এখানে পাসওয়ার্ড রিসেট (Reset) এর কোনো সুযোগ নেই! এছাড়াও কোন কারনে কম্পিউটার ক্রাশ (Crash) করলে ক্রিপ্টোকারেন্সিও চিরতরে হারিয়ে যাবে! এখন পর্যন্ত ২৫ লক্ষ বিটকয়েন হারিয়ে গিয়েছে! ২০১৭ সালের হিসেবে যার মূল্য ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি! বিটকয়েন ওয়ালেট থেকে একজন ব্যক্তি ৭০ মিলিয়ন ডলার হারিয়ে ফেলেছে! সাধারণ মানুষের পক্ষে এত বিপুল পরিমাণ অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ নয়! সে কারণে অনেকেই ক্রিপ্টোকারেন্সি রাখার জন্য এক ধরনের থার্ড পার্টি (third-party) ওয়ালেটের আশ্রয় নেয়, যাদেরকে ক্রিপ্টো ব্যাংক বলে!
যদিও ওয়ালেট গুলো ব্যাংকের মতো নয় বরং মানি এক্সচেঞ্জ এর মত কাজ করে, 
এসব ওয়ালেট ব্যবহার করে সাধারণ টাকাকে ক্রিপ্টোমানি বা ক্রিপ্টোমানিকে সাধারণ টাকায় পরিণত করা যায়! হ্যাকিং (Hacking) এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এ ধরনের বহু ক্রিপ্টোকারেন্সির কোম্পানি ও তাদের বিপুল অর্থ হারিয়েছে!
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ (exchange) বিটস্টাম্প (Bitstamp), টোকিও ভিত্তিক কয়েনচেক (Coincheck) এবং এমটিগোক্স (MT.GOX) বিটফাইনেক্স (Bitfinex), ইথেরিয়াম ক্লাসিক (Etherium Classic) সহ অনেক কোম্পানি হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে! ক্রিপ্টোকারেন্সির উপর কোন দেশের সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অনেক দেশেই এ ধরনের মুদ্রার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে! 
ঝুঁকে থাকা সত্ত্বেও ক্রিপ্টোকারেন্সি এক ধরনের বিপ্লবের মত ছড়িয়ে পড়েছে, বর্তমানে বহু জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ক্রিপ্টোকারেন্সি তে লেনদেন সমর্থন করছে! 

তরুণ প্রজন্ম এই নতুন ধরনের মুদ্রার পিছনে সবচেয়ে বেশি সময় শ্রম ও অর্থ ব্যয় করছে! এর ফলে বিশ্বব্যাপী বহু কিশোর-তরুণ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মিলিয়নিয়ার (Millionaire) হয়ে গেছে! যাদেরকে বলা হয় ক্রিপ্টো মিলিয়নিয়ার ।
তো আজ এই পর্যন্তই, কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে জানাতে পারেন! দেখা হচ্ছে পরবর্তী ব্লগে!
সবাইকে ধন্যবাদ!
Next Post Previous Post
1 Comments
  • Unknown
    Unknown January 28, 2022 at 10:33 PM

    Nice Content sir! Very helpful thank you ☺️

Add Comment
comment url